শিক্ষার প্রসার থেকে টেকসই উন্নয়ন: খালেদা জিয়ার শাসনামলের শিক্ষা রূপান্তর

বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে নব্বইয়ের দশক ও দুই হাজারের শুরুর সময়টি এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এই সময়েই শিক্ষাকে সামাজিক অধিকার ও উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট উদ্যোগ দেখা যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের শাসনামলে শিক্ষা খাতে নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কাঠামোগত সংস্কার দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা।
প্রাথমিক শিক্ষায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ
১৯৯৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ঘোষণা ছিল সেই সময়ের অন্যতম সাহসী সিদ্ধান্ত। শিক্ষার সুযোগকে সর্বজনীন করতে খালেদা জিয়ার সরকার একই বছরে চালু করে ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি, যা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের স্কুলমুখী করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
২০০৩ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠনের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নতুন গতি আসে। একই বছর প্রাথমিক শিক্ষায় বৃত্তি ও উপবৃত্তি চালু হয়। বিএনপি শাসনামলে প্রায় ৭৮ লাখ শিশু নিয়মিতভাবে বৃত্তি পেয়েছে। ২০০১–২০০৬ সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭ শতাংশে।
নারী শিক্ষা ও সামাজিক রূপান্তর
নারী শিক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতি ঘটে খালেদা জিয়ার শাসনামলে। মাধ্যমিক থেকে ডিগ্রি পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়। স্কুলছুট রোধে চালু হয় উপবৃত্তি কর্মসূচি। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৯৬ সালে ছেলে-মেয়ের শিক্ষায় অনুপাত ৫২:৪৮ থেকে ২০০৬ সালে ৫০:৫০-এ পৌঁছে যায়—যা সামাজিক ভারসাম্য ও নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক।
এ সময় মেয়েদের জন্য নতুন ক্যাডেট কলেজ ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়। সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধিও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখে।
মাদরাসা ও ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকায়ন
খালেদা জিয়ার সরকার মাদরাসা শিক্ষাকে মূলধারার সঙ্গে সংযুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। ইবতেদায়ি মাদরাসাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমমান দেওয়া হয় এবং শিক্ষকদের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়। ২০০৩ সাল থেকে ইবতেদায়ি মাদরাসায় বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ শুরু হয়।
২০০৬ সালে ফাজিলকে স্নাতক ও কামিলকে মাস্টার্স ডিগ্রির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই বছরে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান ঘোষণা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য গাজীপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয় মাদরাসা ট্রেনিং ইনস্টিটিউট।
উচ্চশিক্ষার বিস্তার: জাতীয় ও বেসরকারি উদ্যোগ
১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল উচ্চশিক্ষা বিস্তারে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। বর্তমানে এটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে দেশের প্রায় অর্ধেক স্নাতক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
একই বছরে প্রণীত হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন। এর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়, যা আজ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার একটি বড় স্তম্ভ।
দূরশিক্ষণ ও কর্মমুখী শিক্ষা
১৯৯২ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দূরশিক্ষণ ব্যবস্থার সূচনা হয়। কর্মজীবী মানুষ, গ্রামীণ যুবক ও নারীদের জন্য এটি শিক্ষার নতুন দুয়ার খুলে দেয়। স্বল্প সময়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাউবি আজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৃষি শিক্ষায় অগ্রগতি
তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব অনুধাবন করে বিএনপি সরকার গঠন করে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। খালেদা জিয়ার শাসনামলে ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশের চারটি বিআইটিকে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়।
কৃষি শিক্ষায়ও আসে কাঠামোগত পরিবর্তন। কোর্সভিত্তিক এমএস ও পিএইচডি কার্যক্রম চালু হয়। এই ধারাবাহিকতায় কৃষি শিক্ষার ভিত্তি আরও শক্ত হয়।
নকলমুক্ত পরীক্ষা ও শিক্ষা সংস্কার
পাবলিক পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নেয় চারদলীয় জোট সরকার। নকলবিরোধী অভিযানে তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের ভূমিকা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
২০০২ ও ২০০৩ সালে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা চিহ্নিত ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়—যার সুফল আজও দৃশ্যমান।
উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন
বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে শিক্ষা ছিল শুধু একটি খাত নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা, নারী শিক্ষা থেকে প্রযুক্তি ও ধর্মীয় শিক্ষা—সবখানেই ছিল পরিকল্পিত বিস্তারের ছাপ। রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে, শিক্ষা খাতে তার সরকারের নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশের মানব উন্নয়নের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
প্রতিদিনের ক্যাম্পাস/ ওডি