টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ছাত্রদলের অবৈধভাবে হল দখল, চলছে মাদকদ্রব্য সেবন ও বিক্রির কারবারও

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিসি) ক্যাম্পাসের আবাসিক হল ‘দখল’ নিয়ে গুরুতর তথ্য পাওয়া গিয়েছে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ছাত্রদল ও ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের একটি অংশের বিরুদ্ধে। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে এতে ঢাকা কলেজ প্রশাসন পরোক্ষভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে কলেজটির হলে বহিরাগতদের আধিপত্য বিস্তার, সিট বাণিজ্য, অবাধে মাদক দ্রব্য সেবন ও বিক্রি এবং টিটিসির শিক্ষার্থীদের হল ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করে দেওয়া তথ্য ওঠে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে কলেজটির শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও প্রশাসনিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না দাবি শিক্ষার্থীদের।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কলেজটির মুল ফটকের ঠিক সামনেই অবস্থিত যে ছাত্রাবাসটি চোখে পড়ে, সেটিই মূলত বিএড ভবন। ভবনটির তৃতীয় তলার পশ্চিম পাশের ব্লক বর্তমানে ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের অবৈধ দখলে রয়েছে। ওই অংশের প্রবেশমুখে ভাঙা দেয়ালের চিহ্ন এখনো স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ দখল ঠেকাতে এবং কক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে কলেজ প্রশাসন দেয়াল তুলে পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দেয়াল ভেঙে পুনরায় প্রবেশপথ খুলে দেয়।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা নিজ কলেজের হল থাকা সত্ত্বেও হলে উঠতে পারছে না। এমনকি শিক্ষকরাও হলে ওঠানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। বাধ্য হয়েই শিক্ষার্থীদের শর্তসাপেক্ষে রাজনৈতিক ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে হলে উঠতে হচ্ছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে টিটিসি কলেজের বিএড শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক হলের তৃতীয় তলার পশ্চিম পাশের পুরো ব্লক এবং এমএড ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে ঢাকা কলেজের প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থী অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। এখানে গাঁজা, মদ, ফেনসিডিল ও ইয়াবা সেবন এবং বিক্রি করা হচ্ছে। ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুর রহমান আনিস এবং টিটিসি কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক রিয়াদ আহমেদ ও সাবেক সদস্য সচিব বহিষ্কৃত নেতা ফিহান আলম পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে।
প্রধান অভিযুক্ত ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুর রহমান বলেন, টাকার বিনিময়ে ও শর্তসাপেক্ষে টিটিসি কলেজের হলে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের অবৈধভাবে ওঠানোর অভিযোগটি ভিত্তিহীন। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের টিটিসিতে অবৈধভাবে থাকার বিষয়টি সবার জানা। এখানে ঢাকা কলেজের অনেকেই থাকে, শুধু আমার নাম কেন আসবে? এটা ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও হতে পারে। আমি টিটিসিতে ভর্তি হয়েছি,শুধু আমি নই, সবাই মিলে টিটিসির হলে আছি ঢাকা কলেজের হল সংকটের কারণে।
তিনি আরও বলেন, "আসলে যা করি, কয়েকজন ছোট ভাই অসুবিধায় থাকে। তাদের একটি রুমে চাপাচাপি করে থাকতে বলি, দুইজনের জায়গায় তিনজন থাকতে বলি। ঢাকা কলেজে রাজনীতি করি, আমরা কি ছোট ভাইদের কাছ থেকে টাকা নিতে পারি? বরং আমাদের ছোট ভাইদের দিতে হয়।
টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডঃ মোঃ খাদেমুল ইসলাম বলেন, আমি এই কলেজে প্রথম যোগদানের পরই মাঠে ফেনসিডিলের বোতল পড়ে থাকতে দেখেছি। এতে স্পষ্ট হয়, এখানে মাদকের আনাগোনা রয়েছে। এখানে দীর্ঘদিন ধরে তিন চার লক্ষ টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি, এখানে গাঁজা, মদ ও ইয়াবার মতো মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়। এতে অনেক ছেলে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন বলে জানান তিনি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য
জানা গেছে, হলে ওঠানো হচ্ছে শর্তসাপেক্ষে রাজনৈতিক শেল্টারের বিনিময়ে। সেই শর্ত একটাই নিয়মিতভাবে ছাত্রদলের কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে হবে। হলে সিট পেতে আগ্রহী শিক্ষার্থী যদি এই রাজনৈতিক আনুগত্যে সম্মত হন, তবেই মিলছে আবাসন ব্যবস্থা।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, টিটিসি কলেজের নিয়মিত ও বৈধ শিক্ষার্থীরা হলে অবৈধভাবে অবস্থানরত ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
অবৈধভাবে অবস্থানরত ঢাকা কলেজের ২০২৩-২৪ সেশনের এক শিক্ষার্থী নিরাপত্তাশঙ্কায় নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে। তার বক্তব্যের রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে। এই শিক্ষার্থী জানান, হলে ওঠানো হয় শর্তসাপেক্ষে রাজনৈতিক শেল্টারের আওতায়। এখানে প্রধান শর্ত হলো হলে উঠতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ছাত্রদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে হবে। যে কেউ যদি এই শর্তে রাজি হয়, তবেই তাকে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর বিষয়টি দেখে আনিস ভাই।
সূত্রে জানা গেছে, হলে উঠতে এককালীন দুই হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে ওই বহিরাগত শিক্ষার্থীদের। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরেই টিটিসি কলেজের হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ঢাকা কলেজের প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের হাতে।
কলেজ প্রশাসন জানান, এখানে আর্থিক কিছু লেনদেন আছে। অবৈধভাবে যারা আছে তারা অনেকের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়।
ঢাকা কলেজে ৩- ৪ জন প্রভাবশালী শিক্ষার্থী ও টিটিসি কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে কার্যত নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে পুরো পরিস্থিতি। এসব শিক্ষার্থীর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী আশ্রয়দাতা, যাদের কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থা তো দূরের কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কার্যত নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের বিএড ভবনের তৃতীয় তলার পশ্চিম পার্শ্বের ব্লক এবং এম এড ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় প্রায় ১৫০ জন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে অবস্থান করছে। এসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে। কলেজ প্রশাসনের নীরব ভূমিকা এবং প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের সরাসরি হস্তক্ষেপে তারা হল দখল করে আছে। এই দখলের সাথে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক রিয়াদ আহমেদ, বহিষ্কৃত নেতা ফিহান আলম এবং ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আনিস জড়িত। বিএড ভবনের তৃতীয় তলার বিভিন্ন রুমকে মাদকের আতুরঘরে পরিণত করেছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, হল সুপার চাইলেও কার্যকর কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারছেন না।
কলেজ প্রশাসন সূত্র জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিষয়টি স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা এবং ডজনখানেক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে অবহিত করার পরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
হলে অবৈধভাবে অবস্থানরত ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের এক কর্মী বলেন, এখানে উঠতে চাইলে ছাত্রদলের সঙ্গে কথা বলতে হবে, তারা চাইলে ব্যবস্থা করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, সত্যি বলতে, তারা (কলেজ প্রশাসন) চাইলেই আমাদের বের করতে পারত, কিন্তু তারা তেমন কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। আমরাও ধৈর্য ধরে আছি। আমরা শিক্ষার্থী, স্বাভাবিকভাবেই থাকতে চাই।
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, এদেরকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আর্মির সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। এর আগেও আমরা একাধিকবার নোটিস দিয়েছি। আমি নিজে সেখানে গিয়ে দেয়াল তুলে দিয়েছিলাম, কিন্তু পরবর্তীতে তারা সেই দেয়াল ভেঙে ফেলেছে। কলেজ প্রশাসন যদি শক্ত অবস্থান না নেয়, তাহলে আমরা বাইরে থেকে আর কতটুকু কি পারি? যে কোনো উপায়ে তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হোক।
প্রতিদিনের ক্যাম্পাস //এএস