ভারতীয় মালিকানাধীন দলগুলোর পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের প্রতি ‘অনীহা’ নিয়ে জোরালো বিতর্ক

ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট ‘দ্য হান্ড্রেড’-এর আসন্ন নিলামকে কেন্দ্র করে বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন এক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া ভারতীয় মালিকানাধীন দলগুলো পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের দলে নিতে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে ক্রিকেট অঙ্গনে বৈষম্য, ন্যায়বিচার এবং খেলার মাঠে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।
বিবিসি স্পোর্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ১১ ও ১২ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য নিলামে পাকিস্তানের ৬৭ জন ক্রিকেটার নাম নিবন্ধন করলেও ভারতীয় আইপিএল-সংশ্লিষ্ট মালিকানাধীন দলগুলো তাদের এড়িয়ে চলছে। বর্তমানে দ্য হান্ড্রেডের আটটি দলের মধ্যে চারটি ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টস, এমআই লন্ডন, সাউদার্ন ব্রেভ ও সানরাইজার্স লিডস আংশিক বা পুরোপুরি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মালিকানায় রয়েছে।
২০০৯ সাল থেকে কূটনৈতিক তিক্ততার কারণে পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা আইপিএলে নিষিদ্ধ। বিশ্লেষকদের মতে, আইপিএল মালিকদের বৈশ্বিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি একটি ‘অলিখিত নিয়ম’ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তারা তাদের কোনো দলেই পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সুযোগ দেবেন না। বিবিসির হাতে আসা এক বার্তায় দেখা গেছে, ইসিবির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা একজন এজেন্টকে জানিয়েছেন, আইপিএল-সংশ্লিষ্ট নয় এমন দলগুলো থেকেই কেবল পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের প্রতি সীমিত আগ্রহ থাকতে পারে।
বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ভারতীয় মালিকানার প্রভাব এখন আকাশচুম্বী। দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ-২০ লিগের ছয়টি দলের সবকটিই এখন ভারতীয়দের দখলে। আরব আমিরাতের আইএলটি২০ লিগেও ছয়টির মধ্যে পাঁচটি দল আইপিএল মালিকদের। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ ক্রিকেট এবং ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগেও (সিপিএল) তাদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে।
দেখা গেছে, আমিরাতের লিগে আমেরিকান মালিকানাধীন ‘ডেজার্ট ভাইপার্স’ আটজন পাকিস্তানি ক্রিকেটার নিলেও ভারতীয় মালিকানাধীন দলগুলো ১৫টি দেশের খেলোয়াড় নিলেও কোনো পাকিস্তানিকে নেয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আর্থিক আধিপত্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শক্তির ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং খেলোয়াড় নির্বাচনে বৈষম্য তৈরি করছে।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) প্রধান নির্বাহী রিচার্ড গোল্ড গত বছর বলেছিলেন, দ্য হান্ড্রেডে সব দেশের খেলোয়াড়দের সমান সুযোগ থাকা উচিত এবং সেখানে কঠোর বৈষম্যবিরোধী নীতিমালা রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কাউন্টি ক্রিকেট মেম্বার্স গ্রুপ দাবি তুলেছে, যদি জাতীয়তার ভিত্তিতে খেলোয়াড় বাদ দেওয়া হয়, তবে ইসিবিকে অবশ্যই বেসরকারি অংশীদারদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আরও পড়ুন: বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা বেকার বাড়াচ্ছে: শিক্ষামন্ত্রী
বিশ্ব ক্রিকেটারদের সংগঠন ‘ফিকা’র প্রধান নির্বাহী টম মফাট বলেন, ‘প্রতিটি খেলোয়াড়ের ন্যায্য ও সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার আছে। নিয়োগে মালিকদের স্বাধীনতা থাকলেও তা অবশ্যই ন্যায়নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।’
গ্রেটার ম্যানচেস্টার ও লিডসের মতো শহরগুলোতে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মানুষ বাস করেন। ইসিবি যেখানে দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির সঙ্গে ক্রিকেটের সংযোগ বাড়াতে কাজ করছে, সেখানে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি সমর্থকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে।
উল্লেখ্য, গত মৌসুমে মোহাম্মদ আমির ও ইমাদ ওয়াসিম এই লিগে খেলেছিলেন, যা ছিল নতুন বিনিয়োগকারী আসার আগের আসর। বর্তমান টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ে পাকিস্তান পুরুষ দল ষষ্ঠ ও নারী দল অষ্টম স্থানে থাকা সত্ত্বেও তাদের এমন উপেক্ষা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
রাজনীতি ও ক্রিকেটের এই মিশেল কেবল দ্য হান্ড্রেড নয়, বরং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। সম্প্রতি বিসিসিআই-এর নির্দেশে কেকেআর থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে ছাড়তে বাধ্য করার মতো ঘটনাগুলো শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার মতো চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ভারতীয় বিনিয়োগের এই ‘একচেটিয়া নীতি’ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চিরাচরিত স্পিরিটকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।